জীব কাকে বলে? উদ্ভিদ ও প্রাণী কী? বৈশিষ্ট্য ও পার্থক্য।

জীব কাকে বলে?

জৈব বস্তুর মধ্যে জীবন নামক শক্তি বা সত্তা থাকার ফলে ঐ বস্তুর মধ্যে অনুভূতি, প্রজনন ক্ষমতা, বিপাক, বৃদ্ধি ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যগুলো বিদ্যমান তাদেরকে জীব বলে।

জীবের প্রকারভেদ:

জীবজগৎ কে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়। যথা-
১.উদ্ভিদ
২.প্রাণী।

উদ্ভিদ কাকে বলে?

উদ্ভিদ চিত্র
উদ্ভিদ চিত্র

যে সকল জীব নিজেদের খাদ্য নিজেরাই প্রস্তুত করতে সক্ষম ,কঠিন খাদ্য গ্রহণে অক্ষম, ক্লোরোফিল বিশিষ্ট , স্বভোজী, আপাত দৃষ্টিতে চলাচলে অক্ষম এবং সেলুলোজ নির্মিত জড় কোষ প্রাচীর বিশিষ্ট সেসব জীবকে উদ্ভিদ বলে। (ব্যতিক্রম ছত্রাক ক্লোরোফিল বিহীন)।

উদ্ভিদের বৈশিষ্ট্য:

উদ্ভিদের প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্য নিম্নে আলোচনা করা হলো-
১. অপ্রতিসাম্যতা (Asymmetry): উদ্ভিদ দেহ শাখা প্রশাখা ও পাতাযুক্ত হওয়ার ফলে এর দেহের বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যে বন্টন সুষম নয়। তাই উদ্ভিদ দেহ ও অপ্রতিসম।
২. ক্লোরোফিলের উপস্থিতি: অধিকাংশ উদ্ভিদের পাতায় এবং কচি কান্ডে ক্লোরোফিল নামক সবুজ বর্ণের রঞ্জক পদার্থ থাকার কারণে এদের দেহ সাধারণত সবুজ বর্ণের হয় ।এই ক্লোরোফিলের কারণে উদ্ভিদ নিজেদের খাদ্য নিজেরা তৈরি করতে পারে। কোন কোন উদ্ভিদের ক্লোরোফিল থাকে না। যেমন :ছত্রাক।
৩. পুষ্টি: পুষ্টিগত দিক দিয়ে অধিকাংশ উদ্ভিদ স্ব-ভোজি। অর্থাৎ এরা নিজেদের খাদ্য নিজেরাই প্রস্তুত করতে পারে ।গাছের পাতায় ক্লোরোফিল থাকার কারণে এরা সূর্যালোকের সাহায্যে কার্বন-ডাই-অক্সাইড , ও পানি দ্বারা শর্করা জাতীয় খাদ্য তৈরি করে ।উদ্ভিদ কঠিন খাদ্য গ্রহণ করতে পারে না। তবে এরা মূলের মাধ্যমে মাটি থেকে পানি এবং খনিজ লবণ সংগ্রহ করে।
৪. বৃদ্ধি: উদ্ভিদের বৃদ্ধি প্রায় মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত ঘটে। তবে এ বৃদ্ধি স্থানিক। অর্থাৎ ,কেবলমাত্র নির্দিষ্ট স্থানে ঘটে থাকে।
৫. চলাচল: মাটির সাথে স্থায়ীভাবে যুক্ত থাকার ফলে অধিকাংশ উদ্ভিদ চলাচলে অক্ষম ।তবে কিছু নিম্ন শ্রেণীর উদ্ভিদ ফ্লাজেলা নামক উপাঙ্গের মাধ্যমে চলাচল করতে পারে।
৬. কোষীয় গঠন: উদ্ভিদ কোষ সেলুলোজ নির্মিত মৃত কোষ প্রাচীর দ্বারা আবৃত থাকে ।কোষ প্রাচীর কোষের দৃঢ়তা প্রদান করে ।এছাড়া উদ্ভিদ কোষে প্লাস্টিক বা বিভিন্ন ধরনের রঞ্জক পদার্থ এবং এক বা একাধিক বড় কোষ গহবর থাকে।
৭. অঙ্গতন্ত্র: উদ্ভিদের দেহে বিভিন্ন ধরনের অঙ্গ তন্ত্র যেমন- পরিপাকতন্ত্র ,স্নায়ুতন্ত্র ,রক্ত সংবহনতন্ত্র ইত্যাদি অনুপস্থিত। এছাড়া বিভিন্ন উদ্দীপনা গ্রহণের জন্য কোনরুপ ইন্দ্রীয় যেমন- চোখ, কান, নাক ইত্যাদি নেই ।তাই এদের অনুভূতি ক্ষমতা অত্যন্ত দুর্বল।

প্রাণী কাকে বল?

প্রাণী চিত্র
প্রাণী চিত্র

নিজের খাদ্য নিজে তৈরি করতে পারে না। পরভোজি পুষ্টিসম্পন্ন, সাধারণত সচল, উত্তেজনায় সাড়া দিতে সক্ষম ,সুনির্দিষ্ট দেহাকৃতি বিশিষ্ট এবং সেলুলোজ কোষ প্রাচীর বিহীন ,তাদেরকে প্রাণী বলে।

প্রাণীদের বৈশিষ্ট্য:

প্রাণীদের প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্য নিম্নে আলোচনা করা হলো-
১. প্রতিসাম্যতা: প্রাণীদেহের মধ্যে মোটামুটি প্রতিসাম্যতা বিরাজ করে।
২. পুষ্টি: পুষ্টিগত দিক দিয়ে প্রায় সকল প্রাণী পরভোজী। অর্থাৎ এরা নিজেদের খাদ্য নিজেরা প্রস্তুত করতে পারে না (ব্যতিক্রম ইউগ্লেনা)।
৩. বৃদ্ধি: প্রাণীদের বৃদ্ধি দেহের সকল স্থানে একসাথে এবং সুসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ঘটে এবং পরিণত বয়সে বন্ধ হয়ে যায়।
৪. চলাচল: প্রাণীরা সাধারণত মুক্তভাবে চলাচল করতে পারে।
৫. কোষীয় গঠন: প্রাণী কোষে সেলুলোজ নির্মিত কোষ প্রাচীর থাকে না ।এতে সেন্ট্রোজোম, লাইসোজোম, সেন্ট্রিওল, রাইবোজোম, মাইক্রো ভিলাই, ভ্যাকুওল,মাইটোকনড্রিয়া, নিউক্লিয়াস ,গলগি বডি, এন্ডপ্লাজমিক রেটিকুলাম ইত্যাদি বিদ্যমান থাকে।
৬. অঙ্গ তন্ত্র: প্রাণীদেহে বিভিন্ন ধরনের অঙ্গ তন্ত্র যেমন- পরিপাকতন্ত্র ,স্নায়ুতন্ত্র, রক্ত সংবহন তন্ত্র ইত্যাদি উপস্থিত। এছাড়া বিভিন্ন উদ্দীপনা গ্রহণের জন্য ইন্দ্রিয় যেমন- চোখ, কান, নাক ইত্যাদি বিদ্যমান। তাই এদের অনুভূতি ক্ষমতা অত্যন্ত সবল সবল।
৭. আকার আকৃতি: প্রাণীদের আকার আকৃতি নির্দিষ্ট। (ব্যতিক্রম -স্পঞ্জ ,অ্যামিবা)।
৮. সঞ্চিত খাদ্য: প্রাণী কোষের সঞ্চিত খাদ্য গ্লাইকোজেন।

উদ্ভিদ ও প্রাণীর মধ্যে পার্থক্য

উদ্ভিদপ্রাণী
অধিকাংশ উদ্ভিদের আকার ও আয়তন অনির্দিষ্ট এবং অনিয়ত।অধিকাংশ প্রাণীর আকার ও আয়তন নির্দিষ্ট এবং নিয়ত।
অধিকাংশ উদ্ভিদের দেহ শাখা-প্রশাখা যুক্ত। ব্যতিক্রম -স্পাইরোগাইরা।প্রাণী দেহ সাধারণত শাখা প্রশাখা বিহীন। ব্যতিক্রম- পরিফেরা পর্বের কিছু প্রাণী।
ক্লোরোফিল্ক থাকার কারণে অধিকাংশ উদ্ভিদের বর্ণ সবুজ ।ব্যতিক্রম -ছত্রাক।ক্লোরোফিল না থাকায় প্রাণীদেহ সবুজ নয়। ব্যতিক্রম -ইউগ্লেনা।
উদ্ভিদ দেহে শ্বসন পরিপাক ইত্যাদি কার্য সম্পাদনের জন্য সুসংগঠিত তন্ত্র নেই।অধিকাংশ প্রাণীদেহে বিভিন্ন বিপাকীয় কার্যাবলী সম্পাদনের জন্য সুসংগঠিত অঙ্গ তন্ত্র উপস্থিত। যেমন- পরিপাকতন্ত্র, শ্বসনতন্ত্র ইত্যাদি।
উদ্দীপনা গ্রহণের জন্য উদ্ভিদের কোন ইন্দ্রিয় নেই।নিম্ন শ্রেণীর প্রাণী ব্যতীত অধিকাংশ প্রাণীর উদ্দীপনা গ্রহণের জন্য চোখ, কান ,নাক ইত্যাদি ইন্দ্রিয় রয়েছে।
উদ্ভিদ সাধারণত চলাচলে অক্ষম।প্রাণীরা একই স্থান থেকে অন্য স্থানে চলাচল করতে সক্ষম।
উদ্ভিদ কোষে সেলুলোজ নির্মিত মৃত কোষ প্রাচীর দ্বারা আবৃত। এছাড়া উদ্ভিদ কোষে প্লাস্টিড এবং এক বা একাধিক বড় কোষ গহবর আছে ।উদ্ভিদ কোষের সেন্ট্রিওল থাকে না।প্রাণী কোষের সেলুলোজ নির্মিত তৈরি কোষ প্রাচীর বা প্লাস্টিক থাকে না ।কোষ গহবর থাকলেও আকারে অত্যন্ত ক্ষুদ্র। প্রাণী কোষে সেন্ট্রিওল থাকে।
উদ্ভিদ সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় মাধ্যমে নিজের খাদ্য নিজেই তৈরি করতে পারে ।এজন্য এরা স্বভোজী।উদ্ভিদ কঠিন খাদ্য গ্রহণ করতে পারেনা।প্রাণীদেহে সালেকসংশ্লেষণ হয় না। এজন্য এরা পরভোজী ।প্রাণীরা কঠিন, তরল সকল প্রকার খাদ্য গ্রহণ করতে পারে।
কোন ইন্দ্রিয় না থাকায় উদ্দীপনা সারা প্রদানের গতি মন্থর।ইন্দ্রিয় ও স্নায়ুতন্ত্র থাকায় উদ্দীপকের প্রতি দ্রুত সাড়া প্রদান করে।
উদ্ভিদের বৃদ্ধি মৃত্যুর পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত ঘটে। তবে এ বৃদ্ধি দেহের নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ।প্রাণীদেহের বৃদ্ধি নির্দিষ্ট বয়স অবধি হয়ে থাকে। এবং এই বৃদ্ধি সকল অঞ্চলে সমানভাবে ঘটে।

প্রাণীদের সাথে উদ্ভিদের সম্পর্ক কি?

উদ্ভিদ ও প্রাণীর সম্পর্কটা খাবারের সাথে খেয়াল করলে বিষয়টা আরো ভালোভাবে বোঝা যায়। উদ্ভিদের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ক্লোরোফিল যা ফোটোসিনথেসিস প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজন।‌ এটি সূর্যের উপস্থিতিতে কার্বন ডাই অক্সাইড গ্রহণ করে এবং অক্সিজেন উৎপন্ন করে, আবার এই অক্সিজেন প্রাণি গ্রহণ করে জীবন ধারন করে।

Spread the love

Leave a Comment