স্ট্রোক কি? কেন হয়? স্ট্রোকের লক্ষণ ও এর চিকিৎসা।

আমাদের দেহের ২% রক্ত মস্তিষ্ক ব্যবহার করে থাকে। কিন্তু মস্তিষ্কের কোষসমূহ অত্যন্ত সংবেদনশীল। অক্সিজেন সরবরাহের সমস্যা হলে দ্রুত কোষ গুলো নষ্ট হয়ে যায়। এই কোষগুলো শরীরের যে অংশ নিয়ন্ত্রণ করে ওই অংশগুলো বাধা-গ্রস্ত হয়ে যেতে পারে বা তখন শরীরের ঐ অংশ অক্ষম হয়ে পড়ে ।

স্ট্রোক কি?

মস্তিষ্কের ভেতরে রক্ত সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটার ফলে যে অবস্থার সৃষ্টি হয় তাকে বলা হয় স্ট্রোক(stroke)।

স্ট্রোক কত প্রকার?

  • ইস্কেমিক স্ট্রোক (আঞ্চলিকভাবে রক্ত চলাচল বন্ধ হওয়া)
  • হেমোরেজিক স্ট্রোক (মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ)

স্ট্রোকের লক্ষণ সমূহ:

মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা রক্তচলাচল বন্ধ হওয়া এই দুই অবস্থা স্ট্রোকের আওতায় আসে। রোগীরা দুই অবস্থাতেই প্রায় একই ধরনের উপসর্গ বা লক্ষণ দেখা দেয় ।তবে রোগীর অবস্থা কতটা খারাপ তা নির্ভর করে মস্তিষ্কের অঞ্চল সমূহের কোন এলাকায় রক্ত চলাচলে ব্যাঘাত ঘটলো তার উপর, কতটা এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হলো এবং কত দ্রুত অঘটন ঘটে থাকে তার ওপর।

  • মাথা ঘুরানো।
  • হাটতে অসুবিধা হয়।
  • শরীরের ভারসাম্য রক্ষায় অসুবিধা হয়।
  • কথা বলতে সমস্যা হয়।
  • শরীর অবশ হওয়া।
  • শরীর দুর্বল লাগা।
  • শরীরে একপাশ অকেজ হয়ে যাওয়া।
  • চোখে ঘোলা লাগা।
  • চোখে অন্ধকার দেখা বা কোন বস্তুকে ডাবল দেখা।
  • হঠাৎ খুব বেশি মাথা ব্যথা করা।

স্ট্রোক কেন হয়?

স্ট্রোক হওয়ার বিভিন্ন কারণ রয়েছে তার মধ্যে কিছু কারণসমূহ হলো:

  • যাদের উচ্চ রক্তচাপ।
  • বেশি কলেস্টেরল।
  • ডায়াবেটিস বা বহুমূত্র রোগ রয়েছে।
  • ধূমপান করে।
  • মদ্যপান করে।
  • পারিবারিক ইতিহাস বা বংশ পর্যায়ে রয়েছে। (সাধারণত স্ট্রোক ৫৫ বছরের বেশি বয়স্ক পুরুষদের ক্ষেত্রে বেশি হয়।)

স্ট্রোকের রোগ নির্ণয়

অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ, বহুমূত্র (ডায়াবেটিস), মাথায় তীব্র আঘাত, যেকোনো কতিপয় জন্মগত কারণ ।যেমন ধমনীর দেয়ালের দুর্বল অংশ ফেটে যাওয়া ধমনী শিরার ভেতর অস্বাভাবিক সংমিশ্রণ ইত্যাদি থেকে রক্তক্ষরণ সচরাচর ঘটে থাকে। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের পর কোষগুলো ফুলে উঠতে শুরু করে মস্তিষ্ক‌ ভিতর থেকে প্রায় বদ্ধ বিধায় আক্রান্ত মস্তিষ্ক জটিলতার শিকার হয়। মস্তিষ্ক (হাড়নিয়েশোন) হচ্ছে এর পরিণতি অর্থাৎ দুর্বল অংশ গলিয়ে মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বের হয়ে আসে এবং রোগীর দ্রুত মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

স্ট্রোকের রোগ নির্ণয়
স্ট্রোকের রোগ নির্ণয়

ধমনী বা শিরাবাহিত জমাট বাধা রক্তপিন্ড মস্তিষ্কের কোন এলাকায় রক্ত সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটালে জন্ম নেয় স্ট্রোক। রক্ত চলাচল শুন্য ও অকার্যকর মস্তিষ্ক বা সেরিব্রাল ইনফাংশন। এক্ষেত্রে রোগ নির্ণয় দ্রুত প্রয়োজন। জমাট বাধা অম্বরকে দ্রুত ভেঙে ফেলা সম্ভব এবং এর জন্য শল্য চিকিৎসক মাত্র তিন থেকে ছয় ঘন্টা সময় পান ।মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণ জনিত স্ট্রোক একটি ভয়ানক জরুরী অবস্থা।

স্ট্রোক হয়েছে কিনা সেটা বোঝার কিছু উপায়

শারীরিক কিছু পরিমাপ –
১. ব্লাড প্রেসার মাপা
২. রক্তে কলেস্টেরল মাপা
৩. ডায়াবেটিস মাপা
৪. অ্যামাইনো এসিড মাপা

আলট্রা সাউন্ড-
১.ঘাড়ের আরটারির ছবি নিয়ে দেখা যে কোথাও রক্তনালী সরু কিংবা বদ্ধ হয়ে গেছে কিনা।
•আরটারিওগ্রাফি-
১. রক্তনালীতে এক ধরনের রং প্রবেশ করিয়ে এক্সরে করানো হয় এতে রক্ত চলাচলের একটা ছবি পাওয়া যায়।
সিটি স্ক্যান
১. মস্তিষ্কে 3D স্ক্যান করা যায়।
MRI-
১. চুম্বক ক্ষেত্র তৈরি করে দেখার চেষ্টা করা হয় যে মস্তিষ্ক কলার কোন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কিনা
ইকো কার্ডিওগ্রাফি-
১.আল্ট্রা সাউন্ড ব্যবহার করে হৃদপিন্ডের একটা ছবি তুলে দেখা হয় কোন জমাট রক্ত বুদবুদ কিংবা অন্য কিছু রক্ত চলাচল বন্ধ করছে কিনা।

স্ট্রোক প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় সতর্কতা

১. ব্লাড প্রেসার জানা এবং কন্ট্রোল করা
২. ধূমপান না করা
৩. কলেস্টেরল এবং চর্বি জাতীয় খাবার না খাওয়া
৪. নিয়মমাফিক খাবার খাওয়া
৫. সতর্কভাবে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা
৬. নিয়ম করে হাটা বা হালকা দৌড়ানো
৭. দুশ্চিন্তা না করা
৮. মাদক গ্রহণ না করা
৯. মদ্যপান না করা।

চিকিৎসা ও ঔষধ

ইস্কেমিক স্ট্রোকের চিকিৎসা করার জন্য অবশ্যই রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে হবে জমাট বাধা রক্ত ভেঙে তরল করতে হবে। প্রাথমিকভাবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রোগীকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে।

সিটি স্ক্যান( CT Scan),ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স ইমেজিং(MRI )এর মাধ্যমে স্ট্রোকের মাত্রা সম্পর্কে সঠিকভাবে নিশ্চিত হয়ে চিকিৎসা করতে হবে। জমাট বাধা রক্ত তরল করতে যেসব ঔষধ সেবন করতে হবে তার মধ্যে এন্টিপ্লেস (Alteplase) ও এসপিরিন উল্লেখযোগ্য ।

রক্তচাপ কমাতে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো -থায়াজাইড ডাই-ইউরেটিক(Thiazide Diuretics)। এই ওষুধ প্রস্রাবের মাত্রা বাড়িয়ে শরীর থেকে পানির পরিমাণ কমিয়ে দেয় এবং রক্তের পরিমাণ কমে গিয়ে রক্তচাপ কমিয়ে দেয়। রক্তে যদি কোলেস্টেরল বা LDL এর মাত্রা বেশি থাকে তাহলে statin গ্রুপের ওষুধ যেমন : Atorvastatin, Lovastatin দেওয়া যেতে পারে।

(বি.দ্র.ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে ওষুধ গ্রহণ করবেন। ধন্যবাদ)

  • স্ট্রোক এর ইংরেজি কী?

    স্ট্রোক এর ইংরেজি হলো: stroke

Spread the love

Leave a Comment