মাইটোকন্ড্রিয়া কাকে বলে? চিত্র সহ গঠন ও আবিষ্কার।

সজীব উদ্ভিদ ও প্রাণী কোষের সাইটোপ্লাজমে অতি সূক্ষ্ম আবদ্ধ পর্দা বা দণ্ডাকার অঙ্গাণুকে মাইটোকন্ড্রিয়া বলে।

মাইটোকন্ড্রিয়াকে কোষের শক্তিঘর বলা হয় কেন?

জীবের দেহের যাবতীয় কার্যাবলী সম্পাদনের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তির উৎস হলো মাইটোকন্ড্রিয়া। কোষের যাবতীয় জৈবনিক কাজের শক্তি মাইটোকনড্রিয়া সরবরাহ করে। তাই মাইটোকনড্রিয়াকে কোষের পাওয়ার হাউস বা কোষের শক্তিঘর বলে।

মাইটোকন্ড্রিয়া কে আবিষ্কার করেন?

মাইটোকন্ড্রিয়া আবিষ্কারের কৃতিত্ব একক ব্যক্তির নয়, বরং বেশ কয়েকজন বিজ্ঞানীর দীর্ঘ গবেষণার ফসল।

প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ:

১৮৫৭ সালে রবার্ট ব্রাউন কোষের ভেতরে “অণুচক্র” (molecular granules) দেখতে পান। ১৮৮৬ সালে রিচার্ড আল্টম্যান “bioblasts” নামক কোষের অংশ আবিষ্কার করেন, যা পরবর্তীতে মাইটোকন্ড্রিয়া হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

মাইটোকন্ড্রিয়ার নামকরণ:

১৮৯৮ সালে গ্রিক জীববিজ্ঞানী কার্ল বেন্ডা “mitochondria” নামটি প্রবর্তন করেন। “mitos” শব্দের অর্থ “সুতা” এবং “chondrion” শব্দের অর্থ “দানা”।

মাইটোকন্ড্রিয়ার গঠন ও কার্যকারিতা:

  • ১৯১২ সালে প্রথম মাইটোকন্ড্রিয়ার দ্বি-স্তরবিশিষ্ট ঝিল্লি পর্যবেক্ষণ করেন পোর্টার।
  • ১৯৩০-এর দশক এ কেভিন ওয়ার্ডেন “Krebs cycle” আবিষ্কার করেন, মাইটোকন্ড্রিয়ায় ATP উৎপাদনের প্রক্রিয়া।
  • ১৯৫০-এর দশক: জর্জ পalade ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ ব্যবহার করে মাইটোকন্ড্রিয়ার ক্রিস্টি নামক কাঠামো আবিষ্কার করেন।
  • ১৯৬০-এর দশক: Lynn Margulis প্রস্তাব করেন যে মাইটোকন্ড্রিয়া prokaryotic কোষ থেকে উদ্ভূত।

আধুনিক গবেষণা:

আজকের বিজ্ঞানীরা মাইটোকন্ড্রিয়ার জিনোম, প্রোটিন, এবং কোষে এর ভূমিকা নিয়ে গবেষণা করছেন।
মাইটোকন্ড্রিয়া রোগ, বয়স বাড়া, এবং apoptosis-এর সাথে সম্পর্ক নিয়েও গবেষণা চলছে।
মাইটোকন্ড্রিয়া আবিষ্কারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদানকারীদের মধ্যে রয়েছেন:

  • রবার্ট ব্রাউন
  • রিচার্ড আল্টম্যান
  • কার্ল বেন্ডা
  • পোর্টার
  • কেভিন ওয়ার্ডেন
  • জর্জ পalade
  • Lynn Margulis

এই বিজ্ঞানীদের গবেষণা মাইটোকন্ড্রিয়ার গঠন, কার্যকারিতা, এবং উৎপত্তি সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান সমৃদ্ধ করেছে।

মাইটোকন্ড্রিয়ার বৈশিষ্ট্য:

মাইটোকন্ড্রিয়ার বৈশিষ্ট্য নিম্নে আলোচনা করা হয়েছে:

অবস্থান

কোষের আয়তনের প্রায় 20% মাইটোকন্ড্রিয়া। কোষের সাইটোপ্লাজম এর সর্বোচ্চ ছড়িয়ে থাকে ব্যাকটেরিয়া ও নীলাভ সবুজ শৈবাল ব্যতীত সকল জীবকোষে মাইটোকন্ড্রিয়া বিদ্যমান।

উৎপত্তি

বিভাজনের মাধ্যমে মাইটোকন্ড্রিয়া সংখ্যা বৃদ্ধি করে।

আকৃতি

শরীরবৃত্তিয় ও কাজের তারতম্যের ভিত্তিতে মাইটোকন্ড্রিয়ার আকৃতির পরিবর্তন ঘটে। সাধারণত মাইটোকন্ড্রিয়া – গোলাকার, সুত্রাকার, ডিম্বাকার, আংটির মতন ইত্যাদি আকৃতির দেখা যায়।

আয়তন

মাইটোকনড্রিয়ার দৈর্ঘ্য সাধারণত ৩-৭ pm এবং প্রস্থ ০.৫ – ২ pm পর্যন্ত হয়ে থাকে।

সংখ্যা

কোষের কার্যকারিতার উপর মাইটোকন্ড্রিয়ার সংখ্যা নির্ভর করে ।সাধারণত ২০০ -৩০০ পর্যন্ত এক একটি কষে দেখা যায় ।তবে কোন কোন কোষে সর্বাধিক এদের সংখ্যা ১৫। লক্ষ হতে পারে।

মাইটোকন্ড্রিয়ার গঠন ও চিত্র:

মাইটোকন্ড্রিয়া দেহ প্রোটিন ও লিপিড নির্মিত দুটো একক আবরণের দ্বারা গঠিত হয়। মাইটোকনড্রিয়া দ্বিস্তরবিশিষ্ট আবরণী ঝিল্লি দ্বারা গঠিত এর যে অংশে ক্র্যাবস চক্র, ইলেকট্রন ট্রান্সপোর্ট ইত্যাদি ঘটে থাকে।

মাইটোকন্ড্রিয়ার চিত্র - Mitrocondria Picture
মাইটোকন্ড্রিয়ার চিত্র

এর মধ্যে বাইরের মসৃণ আবরণী ও ভিতরের টি অনিয়ত ভাজ হয়ে আঙ্গুলের মত কতগুলো ভাজ সৃষ্টি করে ।এসব ভাজ বা অভিক্ষেপকে ক্রিটিং বলে। এক্ষেত্রে দুটো আবরণীর মাঝে ফাঁকা স্থানের দূরত্ব ৬০ – ৮০A° এখানে কো এনজাইম ,প্রোটিন ,লিপিড ,বিভিন্ন ধরনের এনজাইম RNA ইত্যাদি থাকে।

মাইটোকন্ড্রিয়ার ক্রিস্টিতে স্থানে স্থানে ATP সিনথেটেজ নামক গোলাকার বস্তু থাকে। এতে ATP সংশ্লেষিত হয়। এছাড়া সমস্ত ক্রিস্টি ব্যাপি অনেক ইলেকট্রন ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম পরিলক্ষিত হয়।

রাসায়নিক গঠন

মাইটোকন্ড্রিয়ার প্রোটিন ৬০ – ৭০ % লিপিড ২৫- ৩৫ %,RNA 0.5% ও সামান্য ডিএনএ বিদ্যমান ।মাইটোকন্ড্রিয়ার বহিরাঞ্চলটি প্রোটিন, গ্লিসারাইড লেসিথিন এবং কোলেস্টেরল বহন করে। এছাড়াও ভেতরের অংশটি আ্যলবুমিন ,ভিটামিন ,A,C,B, গ্লুটাথিওন ও কো এনজাইম বহন করে।

মাইটোকন্ড্রিয়ার কাজ

১. মাইটোকনড্রিয়ায় খাদ্যস্ত শক্তি নির্গত হয় তাই একে শক্তিঘর বলা হয়।
২. মাইটোকনড্রিয়া শুক্রাণু ও ডিম্বাণু উৎপাদনে শক্তি যোগায়।
৩. মাইটোকনড্রিয়ায় কিছু পরিমাণ RNA ও DNA উৎপন্ন হয়।
৪. মাইটোকন্ড্রিয়া স্নেহ বিপাকে অংশগ্রহণ করে।
৫. মাইটোকনড্রিয়া পর্যাপ্ত পরিমাণে ক্যালসিয়াম আয়ন ও ফসফেট সঞ্চয় করে।
৬. প্রোটিন সংশ্লেষণের প্রয়োজনীয় এনজাইম ধারণ করে।
৭. হরমোন নিঃসরণ করে।
৮. মাইটোকন্ড্রিয়ায় ক্রেবস চক্রের প্রয়োজনীয় বিক্রিয়া সংঘটিত হয়।

মাইটোকন্ড্রিয়া কোষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি কোষের শক্তি সরবরাহ করে এবং কোষের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

আরো জানুন, কোষ বিভাজন কাকে বলে? ও কি কি? সর্ম্পকে।

ধন্যবাদ।

Spread the love

Leave a Comment